দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় করা মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন ভিকটিমের মা পারভিন বেগম, বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা ও বোন রাইসা আক্তারসহ ১০ জন।
সাক্ষ্যগ্রহণের প্রথম দিন মঙ্গলবার (২ জুন) ঢাকার শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালতে সাক্ষ্য দেন তারা।
সাক্ষ্যগ্রহণে রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা বলেন, ‘১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টায় আমি অফিসে যাওয়ার উদ্দেশে বের হই। অফিস বনানীর কাকলী। ১০টা থেকে সোয়া ১০টার মধ্যে আমার স্ত্রী পারভীনা আক্তারের ফোন পাই। আমাকে বাসায় আসতে বলে। বাসায় এসে দেখি মেইন গেটের সামনে অনেক মানুষ জড়ো হয়ে আছে। এরপর আমি দৌড় দিয়ে ফ্ল্যাটের সামনে যাই। সেখানেও অনেক লোক জড়ো হয়ে আছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার স্ত্রী পাশের ফ্ল্যাটের (আসামিদের) দরজার কড়া নাড়ছে। সবাই মিলে ডাকাডাকি করছে। তখন আমি নিচে গিয়ে একটা হাতুড়ি আনি। ডোর লক হাতুড়ি দিয়ে ভাঙার চেষ্টা করি। তাতে লকটা ভেঙে খুলে যায়। সবাই মিলে পুরো দরজাটাই ভেঙে ফেলি। পরে সবাই ভেতরে যাই। ঢুকেই দেখি ফ্ল্যাটের কমন রুমের ফ্লোরে সামান্য অল্প একটু রক্ত পড়ে রয়েছে। তখন স্বপ্না চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল। কিছু বলছিল না। এক পর্যায়ে তাদের (আসামিদের) বেডরুমের দরজা সবাই মিলে ভাঙি। টয়লেটে বালতিতে মেয়ের বিচ্ছিন্ন মাথা দেখে আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। এরপর কী হয়, আর কিছু বলতে পারি না।’ জেরায় আসামি পক্ষের আইনজীবী বলেন, ‘এই ঘটনা কি আপনি নিজ চোখে দেখেছেন?’ তখন রামিসার বাবা বলেন, ‘আমি যতটুকু দেখেছি ততটুকুই বলেছি।’ সাক্ষ্যগ্রহণে রামিসার মা পারভিন বেগম বলেন, ‘আনুমানিক ১০টা, আমি তখন রান্না করছিলাম। দুই মেয়ের পার্শ্ববর্তী চাচার বাড়িতে যাওয়ার কথা ছিল। গিয়েছে কি না আমি বুঝতে পারিনি। এরপর রান্নাঘর থেকে চিৎকারের শব্দ শুনতে পাই। আমি মনে করি, পাশের ফ্ল্যাটে (আসামিদের) কোনো বাচ্চা হয়তো চিৎকার দিচ্ছে। এদিকে, আমি অপেক্ষা করছি রামিসা এখনো আসছে না কেন। কখন আসবে। কিছুক্ষণ পর বড় মেয়ে একাই বাসায় ফিরে। আমি ওকে রামিসার কথা জিজ্ঞেস করলে বলে, রামিসা আমার সঙ্গে যায়নি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আশপাশ খোঁজ করেও পাচ্ছিলাম না রামিসাকে। সবাইকে রামিসার কথা জিজ্ঞেস করি। কিন্তু সবাই বলে, দেখিনি। নিচে একটা অফিসের কাজ চলছিল। সেখানে ঢুকে দেখি, মেয়ে আছে কি না। এরপর দোতলায় খুঁজি। সেখানেও নেই। আমার পাশের ফ্ল্যাটে দরজায় কড়া নাড়ি। কিন্তু কেউ সাড়া দিচ্ছিল না। হঠাৎ চোখ পড়ে দরজার সামনে মেয়ের একটা স্যান্ডেল। তখন আমার ভাবনায় আসে, মেয়েকে কি এখানে আটকে রেখছে। আমার শব্দ শুনে পাঁচতলা থেকে আসমা নামের এক নারী নেমে আসেন। ধীরে ধীরে আশপাশের লোকজনও চলে আসে। তাদেরকে জানাই রামিসাকে পাওয়া যাচ্ছে না। আমার স্বামীকেও ফোন দেই। অনেকে চেয়ার নিয়ে ওপর দিয়ে উঁকি দিচ্ছে কিন্তু দেখতে পাচ্ছে না।’
পারভিন বেগম বলেন, ‘পরে দরজা ভেঙে সবাই ভেতরে ঢুকি। তখন রাজু নামের একটি ছেলে ভিডিও করছিল। স্বপ্না হাটাহাটি করছিল। বেডরুমের দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকলে বাথরুমে অসংখ্য রক্ত দেখতেই পাই। এরপর রামিসার বিচ্ছিন্ন মাথাও দেখি। পুলিশ এসে রামিসার জামা ও মরদেহ উদ্ধার করে। স্বপ্নাকে আমি অনেকবার বলেছি, বোন দরজাটা খুইলা দে, খুইলা দে। কিন্তু ও খোলে নাই। আমি ওকে কোনো প্রশ্ন করতে পারিনি। উপস্থিত লোকজনই ওকে প্রশ্ন করেছে। পরে আমি তাদের কাছ থেকে শুনতে পাই, সোহেল রানা গ্রিল কেটে পালাইছে।’ কাঠগড়ায় দাঁড়ানো সোহেল রানার দিকে আঙ্গুল তুলে রামিসার মা বলেন, ‘হত্যা ও করছে। সে-ই ধর্ষণ করছে।’ এদিকে, রামিসার বোন রাইসা আক্তার শিশু সাক্ষী হওয়ায় ক্যামেরা ট্রায়ালে সাক্ষ্যগ্রহণ চলে। পরে সাক্ষ্যগ্রহণে এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, ‘পাশের বাসায় নাশতা করার সময় এক প্রতিবেশী দেখেন, একজন খালি গায়ে সেই ফ্ল্যাটের জানালা দিয়ে নেমে দৌড়ে চলে যাচ্ছে। আমি অনেকবার চোর চোর করে চিৎকার করি। কিন্তু কোনো রেসপন্স পাইনি। কিছুক্ষণ পর মানুষের চিৎকার শুনে আমি ঘটনাস্থলে গিয়ে রামিসার মরদেহ দেখতে পাই। পরে মানুষের কাছে আমি ঘটনার বর্ণনা জানতে পারি।’ এদিন সকাল পৌনে ৯টায় মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানাকে ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগার কেরানীগঞ্জ থেকে এবং তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুনকে কাশিমপুর কারাগার থেকে আদালতে আনা হয়। পরে তাদের আদালতে তোলা হয়।
কে